আজকের পৃথিবীতে ইন্টারনেট ছাড়া একটি দিন কল্পনা করাও কঠিন। ঘুম থেকে ওঠার পর মোবাইলে খবর দেখা থেকে শুরু করে অনলাইন ব্যাংকিং, ভিডিও দেখা, সামাজিক যোগাযোগ, অফিসের কাজ কিংবা দূরের কারও সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে কথা বলা সবকিছুর সঙ্গেই ইন্টারনেট ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।
কিন্তু প্রতিদিন ব্যবহার করলেও ইন্টারনেটের বিশালতা সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই জানি না। পৃথিবীর কত মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন? প্রতিদিন কতবার Google-এ সার্চ করা হয়? Facebook-এ কত মানুষ সক্রিয়? YouTube-এ প্রতিদিন কত ভিডিও আসে? এমনকি পুরো ইন্টারনেটের ওজন কত—এমন প্রশ্নের উত্তরও বেশ অবাক করার মতো।
চলুন জেনে নেওয়া যাক ইন্টারনেট জগত সম্পর্কে ৭টি আশ্চর্য তথ্য।
১. পৃথিবীতে ইন্টারনেট ব্যবহারীর সম্পর্কে তথ্যঃ
ইন্টারনেট এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়; এটি বিশ্বের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (ITU)-এর ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৬০০ কোটি মানুষ, অর্থাৎ পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৪ শতাংশ, ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২৪ কোটি বেড়েছে।
অর্থাৎ, পৃথিবীর প্রতি চারজন মানুষের মধ্যে প্রায় তিনজন এখন কোনো না কোনোভাবে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত। তবে এর বিপরীত চিত্রটিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালেও পৃথিবীর প্রায় ২২০ কোটি মানুষ ইন্টারনেটের বাইরে ছিলেন। অর্থাৎ প্রযুক্তি যত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখনও ডিজিটাল সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা আগামী বছরগুলোতে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্মার্টফোন, সস্তা মোবাইল ডেটা, দ্রুতগতির নেটওয়ার্ক এবং স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বিস্তারের কারণে বিশ্বের আরও অনেক মানুষ অনলাইনে যুক্ত হচ্ছেন। ভাবুন তো—পৃথিবীর প্রায় ৬০০ কোটি মানুষ একই ডিজিটাল নেটওয়ার্কের কোনো না কোনো অংশ ব্যবহার করছেন!
তথ্যসূত্র: International Telecommunication Union (ITU), Facts and Figures 2025.
২. Facebook সম্পর্কে মজার তথ্যঃ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথা বললে Facebook-এর নাম সবার আগে আসে। ২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্ল্যাটফর্মটি এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অনলাইন কমিউনিটিতে পরিণত হয়েছে। Meta-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষ দিকে Facebook-এর মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ছিল প্রায় ৩০৭ কোটি এবং দৈনিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ছিল প্রায় ২১১ কোটি। অর্থাৎ শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই পৃথিবীর কয়েকশ কোটি মানুষ নিয়মিত যুক্ত ছিলেন।
Facebook-এর বিস্তৃতি শুধু বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে এখানে সংবাদ, বিনোদন, ব্যবসা, ভিডিও, লাইভ স্ট্রিমিং, অনলাইন কমিউনিটি এবং বিভিন্ন ধরনের কনটেন্টের বিশাল জগৎ তৈরি হয়েছে।
আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য হলো Facebook এখন কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্যও বিশাল একটি আয়ের প্ল্যাটফর্ম। Meta জানিয়েছে, ২০২৫ সালে Facebook প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার কনটেন্ট নির্মাতাদের অর্থ প্রদান করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ Facebook শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি এখন কোটি কোটি মানুষের জন্য ব্যবসা ও আয়ের একটি বড় প্ল্যাটফর্মও।
তথ্যসূত্র: Meta এবং Meta Investor Relations.
৩. Google-এ সার্চ সম্পর্কে তথ্যঃ
কোনো কিছু জানতে হলে আজকাল আমরা প্রথমেই Google-এ সার্চ করি। “আজকের আবহাওয়া কেমন?”, “কীভাবে মোবাইল ঠিক করব?”, “কোন ফোনটি ভালো?”, “কোথায় চাকরি পাওয়া যাবে?” প্রতিদিন কোটি কোটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয় Google Search-এর মাধ্যমে।
Google-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ৫ ট্রিলিয়নেরও বেশি সার্চ Google-এ করা হয়। ৫ ট্রিলিয়ন সংখ্যাটি কত বড়, তা কল্পনা করাও কঠিন। এটিকে দৈনিক হিসাবে ভাগ করলে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৩৭০ কোটি সার্চের সমপরিমাণ হয়। আরও মজার ব্যাপার হলো, Google-এর কাছে প্রতিদিন করা সার্চের প্রায় ১৫ শতাংশ এমন প্রশ্ন, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। অর্থাৎ মানুষ প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রশ্ন নিয়ে Google-এর কাছে আসছে।
Google আরও জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন কোটি কোটি ভিজিট ওয়েবসাইটে পাঠায় তাদের Search। তাই কোনো ওয়েবসাইটের জন্য Google Search কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সহজেই বোঝা যায়। একটি ভালো ওয়েবসাইট Google Search থেকে নিয়মিত ভিজিটর পেলে তার ব্যবসা ও আয়—দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: Google Search এবং Alphabet-এর প্রকাশিত তথ্য।
৪. একটি Domain সম্পর্কে তথ্যঃ
আপনি হয়তো মনে করতে পারেন, একটি Domain Name কিনতে কয়েকশ বা কয়েক হাজার টাকা খরচ করলেই হয়। সাধারণ Domain-এর ক্ষেত্রে কথাটি সত্যি। কিন্তু ইন্টারনেটের দুনিয়ায় কিছু Domain Name-এর মূল্য এত বেশি যে তা শুনলে অবাক হতে হয়। সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো Cars.com। বিভিন্ন শিল্প-তথ্যসূত্রে এটিকে প্রায় ৮৭২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সবচেয়ে ব্যয়বহুল Domain-সম্পর্কিত লেনদেন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। Cars.com-এর ৮৭২ মিলিয়ন ডলারের অঙ্কটি শুধু Domain Name-এর জন্য আলাদা করে দেওয়া দাম ছিল না; এটি একটি বড় ব্যবসায়িক লেনদেনের অংশ ছিল। তাই এটিকে সরাসরি শুধু Domain বিক্রির দাম বলা পুরোপুরি সঠিক নয়। শুধু Domain-এর স্বাধীন বিক্রির হিসাব ধরলে AI.com-এর মতো ছোট ও আকর্ষণীয় Domain-এর দামও কয়েক কোটি ডলারে পৌঁছেছে বলে রিপোর্ট করা হয়েছে।
কেন একটি Domain এত দামি হতে পারে? কারণ একটি ছোট, সহজে মনে রাখা যায় এমন এবং জনপ্রিয় Keyword-সমৃদ্ধ Domain একটি ব্যবসার জন্য বিশাল ব্র্যান্ডিং সুবিধা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে .com Domain-এর ক্ষেত্রে মূল্য আরও বেশি হতে পারে। অর্থাৎ ইন্টারনেটের দুনিয়ায় Domain Name অনেকটা ডিজিটাল জমির মতো—সঠিক নামটি যদি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়, তার মূল্যও আকাশছোঁয়া হতে পারে।
তথ্যসূত্র: GoDaddy ও Domain industry reports.
৫. YouTube সম্পর্কে অজানা তথ্যঃ
ভিডিও দেখার কথা বললেই অধিকাংশ মানুষের মাথায় প্রথমে যে প্ল্যাটফর্মটির নাম আসে, সেটি হলো YouTube। YouTube-এর বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, প্ল্যাটফর্মটিতে প্রতিদিন গড়ে ২ কোটিরও বেশি ভিডিও আপলোড করা হয়। একটু হিসাব করলে বিষয়টি আরও অবিশ্বাস্য মনে হবে। প্রতিদিন ২ কোটি ভিডিও মানে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ৮ লাখের বেশি ভিডিও এবং প্রতি মিনিটে প্রায় ১৪ হাজারের কাছাকাছি ভিডিও আপলোড হওয়ার সমপরিমাণ। অবশ্য এটি গড় হিসাব এবং YouTube-এর বিভিন্ন ধরনের আপলোড ও কনটেন্টের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।
YouTube-এর দর্শক সংখ্যাও বিশাল। প্ল্যাটফর্মটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে ২ বিলিয়নের বেশি লগ-ইন করা দর্শক YouTube ব্যবহার করেন। আর Shorts-এর জনপ্রিয়তাও বিস্ময়কর। YouTube জানিয়েছে, Shorts বর্তমানে প্রতিদিন ২০০ বিলিয়নেরও বেশি ভিউ পাচ্ছে। অর্থাৎ আপনি যখন এই লেখাটি পড়ছেন, ঠিক সেই সময় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য মানুষ YouTube-এ নতুন ভিডিও আপলোড করছেন এবং কোটি কোটি মানুষ সেগুলো দেখছেন।
তথ্যসূত্র: YouTube Press এবং YouTube Blog.
৬. ইন্টারনেটের ওজন সম্পর্কে কিছু তথ্যঃ
প্রথমে প্রশ্নটি শুনে মনে হতে পারে, ইন্টারনেট তো কোনো বস্তু নয়—তাহলে তার ওজন কীভাবে হবে? সত্যি বলতে, “ইন্টারনেটের ওজন” নির্দিষ্টভাবে মাপার কোনো একক উত্তর নেই। কারণ ইন্টারনেট বলতে সার্ভার, কম্পিউটার, কেবল, রাউটার ও অন্যান্য হার্ডওয়্যারকে বোঝালে তার ওজন হবে বিপুল। কিন্তু যদি আমরা ইন্টারনেটে থাকা তথ্যকে বৈদ্যুতিক শক্তি ও ইলেকট্রনের মাধ্যমে হিসাব করার চেষ্টা করি, তখন একটি আশ্চর্যকর ধারণা পাওয়া যায়।
পদার্থবিদ্যার কিছু তাত্ত্বিক হিসাব অনুযায়ী, ইন্টারনেটের তথ্য সংরক্ষণ ও স্থানান্তরের জন্য ব্যবহৃত শক্তির ভরের সমতুল্য পরিমাণ কয়েক দশ গ্রাম, প্রায় ৫০ গ্রাম-এর কাছাকাছি হতে পারে। অর্থাৎ একটি ধারণাগত হিসাব অনুযায়ী, ইন্টারনেটের তথ্যের ওজন একটি ছোট স্ট্রবেরি বা আলুর মতো হালকা হতে পারে!
তবে মনে রাখতে হবে, এটি ইন্টারনেটের বাস্তব হার্ডওয়্যার বা সমস্ত ডেটার মোট ওজন নয়। এটি শক্তি ও তথ্যের ভর নিয়ে করা একটি তাত্ত্বিক হিসাব। ইন্টারনেটের সার্ভার, ডেটা সেন্টার, ফাইবার-অপটিক কেবল, রাউটার ও অন্যান্য অবকাঠামোর ওজন অবশ্যই বিশাল। এই কারণেই “ইন্টারনেটের ওজন ৫০ গ্রাম”—এটিকে একটি মজার বৈজ্ঞানিক অনুমান হিসেবে দেখা উচিত, সুনির্দিষ্ট পরিমাপ হিসেবে নয়।
৭. ইন্টারনেট সম্পর্কে মজার তথ্যঃ
অনেকে মনে করেন, আমরা যখন বাংলাদেশ থেকে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে কাউকে ভিডিও কল করি, তখন তথ্য সরাসরি কোনো স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মহাকাশ ঘুরে সেখানে যায়। বাস্তবে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট যোগাযোগের একটি বিশাল অংশ সমুদ্রের নিচে থাকা সাবমেরিন ফাইবার-অপটিক কেবল ব্যবহার করে। এই কেবলগুলো সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে এক দেশ ও মহাদেশকে অন্য মহাদেশের সঙ্গে যুক্ত করে। কেবলগুলোর ভেতর দিয়ে আলো ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ডেটা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে স্থানান্তরিত হয়।
ভাবুন, আপনার ফোন থেকে পাঠানো একটি ছবি বা ভিডিও হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা কোনো ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এর পেছনে থাকতে পারে সমুদ্রের তলদেশে থাকা বিশাল কেবল নেটওয়ার্ক। এই অবকাঠামো এত গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো বড় সাবমেরিন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে নির্দিষ্ট অঞ্চলে ইন্টারনেটের গতি কমে যেতে পারে বা আন্তর্জাতিক যোগাযোগে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অর্থাৎ আমরা যে “ওয়্যারলেস” ইন্টারনেট ব্যবহার করি, তার পেছনেও রয়েছে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ তার, ফাইবার, ডেটা সেন্টার ও নেটওয়ার্ক অবকাঠামো। ইন্টারনেট আসলে আকাশে ভাসমান কোনো অদৃশ্য জাদুর জগৎ নয় এর পেছনে রয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বিশাল ও জটিল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো।
** প্রযুক্তির নতুন নতুন তথ্য জানতে প্রযুক্তি সারাদিনের সঙ্গে থাকুন।**

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন